বিষয়সমুহ

 

 ইতিহাস 

   ইতিহাস ও ঐতিহ্য              মুক্তিযুদ্ধ     

  

শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি           গুণীজন

  

    জেলা প্রশাসন            স্থানীয় সরকার

 

 সরকারি দপ্তরসমূহ          শিক্ষা সংক্রান্ত

  

       কৃষি ও বন                 ভ্রমণ

  

 পরিবহন ও যোগাযোগ      অর্থ ও বানিজ্য

  

    সমাজ কল্যাণ              স্বাস্থ্য বিষয়ক

  

        গণ-মাধ্যম                 রাজনীতি 

               

                      অন্যান্য

মহাত্মা কে ডি ঘোষ স্মরণে.. ‘শুভ্র সমুজ্জ্বল’ PDF Print
Wednesday, 18 August 2010 20:03

মহাত্মা কে ডি ঘোষ স্মরণে.. শুভ্র সমুজ্জ্বল

অসিতবরণ ঘোষ

রূপসী রূপসাবিধৌত খুলনা নগরীর বিগত দেড় শত বছরের ইতিবৃত্তে যে-কটি সূর্যসঙ্কাস ব্যক্তিত্ব তাঁদের বিরল মানবহিতৈষণা, দুর্লভ কমৈষণা, প্রগাঢ় ও আত্মঅবলোপী সেবাপরায়নণতার অক্ষয় স্বাক্ষর রেখে গেছেন, মহাযোগী, মহাকবি ও দিব্যজীবনের রূপকার শ্রীঅরবিন্দের পিতা প্রখ্যাত ডাঃ কে ডি ঘোষ -ডাঃ কৃষ্ণধন ঘোষ-তাঁদের মধ্যে অন্যতম ও অগ্রগণ্য।

গঙ্গার পশ্চিম তটাশ্রয়ী ছোট্ট জেলা হুগলী। আকারে-আকৃতিতে ক্ষুদ্র হলেও সন্তানগৌরবে এই জেলাটি অবিভক্ত বাংলার প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও আধুনিক ইতিহাসে এক বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ব্যাপী যে নবজাগৃতি তৎকালীন বাংলাকে সমগ্র ভারতের আলোকবর্তিকায় পরিণত করেছিল, সেই নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ ঋত্ত্বিকদের মধ্যে রাজা রামমোহন, বিশ্বঅধ্যাত্মসাধনজগতের অনন্যসাধারণ মহামানব শ্রীরামকৃষ্ণ, বাংলার সিংহপুরুষ আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং বাংলা কথাসাহিত্যের জন-গণ-মন-অধিনায়ক দরদী ও অমর শিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই হুগলী জেলার পুণ্যভূমিতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই জেলার অন্তর্গত কোন্নগরের বিখ্যাত ঘোষ পরিবারেই কৃষ্ণধনের জন্ম। আভিজাত্যে ও শিক্ষাদীক্ষার কারণে কোন্নগরের ঘোষদের খ্যাত তৎকালীন বাংলার শিক্ষিত সমাজে সর্বজনস্বীকৃত ছিল। তৎকালীন ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম প্রধান নেতা ও অনন্যসাধারণ সমাজহিতৈষী শিবচন্দ্র দেব এবং ব্রিটিশ সরকারের মিউনিসিপ্যাল এ্যাক্ট-এর যুগ্ম প্রণেতা রাজা দিগম্বর মিত্র এবং ডাঃ ত্রৈলক্যনাথ মিত্র এই কোন্নগরের সুসন্তান ছিলেন। ডাঃ কৃষ্ণধন ঘোষ-এর স্বোপার্জিত গৌরবের পাশাপাশি তাঁর আত্মীয় গৌরবও কম ছিল না। ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম পুরোধা, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের একান্ত স্বজন ও কিশোর রবীন্দ্রনাথের অন্যতম আদর্শ ব্যক্তিত্ব এবং তৎকালীন বাংলার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক জাগরণের অগ্রদূত ঋষি রাজনারায়ণ বসু ছিলেন তাঁর শ্বশুর। সর্বোপরি, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, পূর্ণ স্বাধীনতার প্রথম দাবীদার এবং অধ্যাত্মসাধনার ব্যতিক্রমী সাধক, কবির্মনীষী শ্রীঅরবিন্দ ছিলেন তাঁর তৃতীয় পুত্র এবং আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ যাকে ‘অগ্নিযুগের সাগ্নিক পুরোহিত’ অভিধায় আখ্যায়িত করে উৎসর্গ করেছিলেন, সেই বারীন্দ্রনাথ ঘোষ ছিলেন তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র।

 

এর পরও বলতে হয় নিছক স্থানগৌরব, বংশকৌলিন্য বা স্বজনগৌরবের মহিমায় গৌরবান্বিত ছিলেন না ডাঃ কৃষ্ণধন ঘোষ। ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব, পুরুষ ও পৌরুষ, মানুষ ও মনুষ্যত্ব -এই শব্দগুলির অবস্থান ব্যাকরণগ্রন্থ বা অভিধানে খুব কাছাকাছি থাকার কারণে কিনা জানিনা, মানুষের জীবনে ও জীবনাচরণে এদের মধ্যকার ব্যবধান দুস্তর। যুগে যুগে মুষ্টিমেয় ও ব্যতিক্রমী কিছু বাঙালিসুলভ চারিত্র্যধর্মের কলঙ্কজাল ছিন্ন করে ব্যক্তিত্ব, পৌরুষ ও মনুষ্যত্বের বিজয়বৈজয়ন্তী উড়িয়ে আমাদের জাতকুলমান রক্ষা করেছেন বলেই জাতি হিসাবে আমরা আজও বেঁচেবর্তে আছি। ডাঃ কে ডি ঘোষ এঁদেরই অন্যতম। ব্যতিক্রমী এই পুরুষসিংহ অতি সহজেই প্রাগুক্ত সে দূরত্ব ও দ্বৈধ ঘুচিয়েছিলেন আপন চরিত্রবিভায়, চরিত্রবৈভবে এবং কর্মগৌরবে - ইতিহাস ব্যক্তির গুণকীর্তন নয়-এ রবীন্দ্র-শাসন মাথা পেতে গ্রহণ করে নিয়েই ডাঃ কে ডি ঘোষ সম্পর্কে এ কথা উল্লেখ্য।

 

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকগুলিতে যখন ভারতের, বিশেষ করে বাংলার, উচ্চশিক্ষিত সমাজের একটি বড় অংশ নবজাগরণ মন্ত্রে উজ্জীবিত, ঠিক সেসময় কৃষ্ণধনের শিক্ষাজীবনের শুরু ও শেষ। ১৮৫৮ সালে কোন্নগরের উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি সগৌরবে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এর চার বছর পর যখন তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজ-এর চতুর্থ বর্ষের ছাত্র তখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অগ্রদূত মহাত্মা রাজনারায়ণ বসুর জ্যেষ্ঠা কন্যা স্বর্ণলতা দেবীর সাথে তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। ১৮৬৯ সালে ডাঃ ঘোষ ইংল্যান্ড যান এবং স্কটল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত এ্যাবার্ডিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেময়কার দুর্লভ এম.ডি (ডক্টর অব মেডিসিন) ডিগ্রী অর্জন করেন, যা তাঁর আগে কোন বাঙালি অর্জন করতে পারেননি। বিদেশে  বিরল গৌরব অর্জন ক’রে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেও তাঁর এই  প্রত্যাবর্তন তাঁর জীবনে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। তৎকালীন হিন্দু সমাজের একটি বৃহৎ অংশ ধর্মীয় অন্ধত্ব, গোড়ামি ও কুসংস্কারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিল। সমাজপতিদের একান্ত আশ্রিত ও অনুগত শাস্ত্রজীবী পুরোহিত সমাজ পুরবাসীর হিত অপেক্ষা আপন স্বার্থ- সিদ্ধিকেই সাধন করতেন। ফলে, তাদের মনগড়া শাস্ত্র হয়ে বৃহত্তর সমাজের সর্বনাশ শ্রেয়জ্ঞান করত। কৃষ্ণধনকে তারা ‘কালাপানি’ অর্থাৎ দূষিত সমুদ্র পার হয়ে ম্লেচ্ছদের দেশে যাওয়ার অপরাধে (?) প্রায়শ্চিত্ত করতে হুকুম জারি  করলেন। অন্যথায় তাঁকে গ্রাম- তার আপান জন্মভূমিতে-প্রবেশ করতে দেবেন না। রোষে জ্বলে উঠলেন সিংহপুরুষ ডাঃ কৃষ্ণধন, বিলেত গিয়ে তিনি কোন অন্যায় করেন নি, বরং বাংলার জন্য বাঙ্গালি জাতির জন্য বয়ে নিয়ে এসেছেন এক বিরল সম্মান। কাজেই কোন কুযুক্তিতেই, কোন প্রকার ভয়-ভীতিতেই তিনি প্রায়শ্চিত্ত করবেন না, করার প্রশ্নই ওঠে না। অধঃপতিত সেই সমাজপতিরা সেদিন কৃষ্ণধনকে তাঁর বিধবা মায়ের সাথেও দেখা করতে দেয়নি। কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও মনুষ্যত্ববিবর্জিত ধর্মান্ধ হিন্দু সমাজের প্রতি কী প্রচন্ড ঘৃণা ও দ্রোহ বুকে নিয়ে সেদিন তিনি চিরদিনের মত তার জননী ও জন্মভূমি ত্যাগ করে এসেছিলেন তা আজও আমরা অনুভব করতে পারি।

 

জীবনের প্রথম পর্যায়ে ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকর্ষণ এবং বিলেতে যাওয়ার আগে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার জৌলুষে বিভ্রান্ত না হওয়ার সতর্কবাণী সত্ত্বেও কৃষ্ণধন দেশে ফিরলেন পোষাকে-আশাকে, চলনে-বলনে, খানা-পিনায় ও আদব-কায়দায় পুরোদস্তুর সাহেব হয়ে। শুধু তাই নয়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সেই ঠাট-ভাব পুরোপুরি বাজিয়ে রেখেছিলেন। এমনিতেই পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার প্রতি তার ছিল প্রবল অনুরাগ। তার উপর জন্মভূমির সমাজপতিদের হৃদয়হীনতা, অন্ধত্ব ও কূপমন্ডুকতা তাকে সামগ্রিকভাবে বাঙালি হিন্দুসমাজের প্রতি বিদ্বিষ্টি করে তুলেছিল। বলা বাহুল্য, সে হিন্দু সমাজ ছিল সংখ্যালঘিষ্ঠ অথচ প্রবল ছিল প্রতাপান্বিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন উচ্চবর্গীয় হিন্দু সমাজ। এই বিরূপতা এতই প্রবল ছিল যে অতি শৈশব থেকেই তার সন্তানদেরকে বাঙালি সমাজের যাবতীয় প্রভাব থেকে দূরে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলেন তিনি। বাড়িতে বাংলায় কথাবার্তা বলাও নিষিদ্ধ ছিল ; চাকর-বাকর যা রাখতেন তারা হয় হিন্দিভাষী নয়ত ইংরাজিভাষী। ফলে, শ্রীঅরবিন্দ শিশুকাল থেকে মাতৃভাষা, যা কিনা মাতৃদুগ্ধবৎ, তা থেকে ছিলেন বঞ্চিত; বাংলা শিখেছিলেন একুশ বছর বয়সে, অর্থাৎ চৌদ্দ বছরের বিলেতের প্রবাস জীবন সাঙ্গ ক’রে চাকুরিসূত্রে বরোদায় এসে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কৃষ্ণধন ঘোষের স্ত্রী স্বর্ণলতা দেবী মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে মায়ের উষ্ণ সান্নিধ্য থেকে অতি শৈশব থেকেই বঞ্চিত ছিলেন শ্রীঅরবিন্দ। পরগৃহে জন্মলাভ  করা এই শিশুটি মাতৃস্নেহ ও মাতৃভাষা থেকে বঞ্চিত এবং পাঁচ বছর বয়স থেকে একুশ বছর বয়স পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিজাতীয় শিক্ষা-সংস্কৃতির মধ্যে লালিত-পালিত হয়ে (পাঁচ থেকে সাত বছর দার্জিলিং-এর খ্রিষ্টান মিশনারী পরিচালিত লরেটো কনভেন স্কুলে) পরবর্তীকালে স্বদেশপ্রেমের এবং বাংলার, তথা সমগ্র ভারতবর্ষের স্বধীনতার জ্বলন্ত বিগ্রহে পরিণত হয়েছিলেন কোন অদৃশ্য মহাকাল-দেবতার দুর্লঙ্ঘ্য নির্দেশে তা গবেষনার দাবী রাখে। তবে, সেই অপার রহস্যের কঠিন প্রাচীর ভেদ করে দু’একটি আলোকরশ্মি আমরা দেখতে পাই এই ক্ষণজন্মা পিতা-পুত্রের দ্বৈতাদ্বৈত সম্পর্কে নিরিখে।

 

ডাঃ কৃষ্ণধন ঘোষের পাশ্চাত্য বা ইংরেজপ্রীতি অন্ধ বা নির্বিবেক ছিল, এমনটি মনে করা অত্যন্ত অসঙ্গত হবে। ইংরেজদের জীবন-জিজ্ঞাসা, জীবন-তৃষা, জ্ঞান-পিপাসা, কর্মোদ্দীপনা ও সুশৃঙ্খল জীবন তাকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু আলোর নিচে অন্ধকারের উপলব্ধি ঘটতে তার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। বিলেত থেকে উচ্চ ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরে রংপুর জেলার সিএমও (চীফ মেডিকেল অফিসার) হিসাবে কর্মরত থাকাকালে সেখানকার আত্মবর্গী ও উদ্ধত প্রকৃতির ইংরেজ জেলাশাসক  কৃষ্ণধনে সুখ্যাতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে নানাভাবে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন। অকুতোভয়  কৃষ্ণধন মাথা নোয়াবার পাত্র ছিলেন না। ফলে, অচিরেই সেই ইংরেজ দুঃশাসকের ক্রোধের শিকার হয়ে তাঁকে জেলা শহর রংপুর থেকে তৎকালীন মহকুমা শহর খুলনায় বদলি হয়ে আসতে হয়। হতে পারে তখন থেকেই ইংরেজ সভ্যতার চোখ-ধাঁধানো আলোর পিছনে অন্ধকারের দীর্ঘ পুচ্ছটি ক্রমশ তার দৃষ্টিগোচর হতে থাকে।

 

পরবর্তীতে, অর্থাৎ খুলনায় অবস্থান কালে, তিনি ইংল্যান্ডে অধ্যয়নরত তিন পুত্রকে (মনমোহন, বিনয়ভূষণ, অরবিন্দ), বিশেষকরে তার বিশেষ স্নেহের অরোকে (অরবিন্দকে তিনি এই নামেই ডাকতেন) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘দ্য বেঙ্গলি’ নামক ইংরাজি দৈনিকের পাতায় প্রকাশিত এদেশে ইংরেজ সরকারের অত্যাচার, নির্যাতন ও অবিচারের কাহিনী কাগজ কেটে কেটে দাগিয়ে দিয়ে ডাকযোগে পাঠিয়ে দিতেন এবং দখলদার সরকারের, কৃষ্ণধনের ভাষায়‌-injustice, inelasticity and heartlessness`,অর্থাৎ ‘অবিচার, অনমনীয়তা এবং হৃদয়হীনতা’- র বিরুদ্ধে সুযোগমত প্রতিবাদ করতে নির্দেশ দিতেন। ১৮৯৩ সালে একুশ বছর বয়সে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অব্যবহিত পূর্বে অরবিন্দ যে তাঁর দুই অগ্রজসহ দেশমাতৃকার মুক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত লন্ডনের একটি গোপন সংগঠন, ‘লোটাস এ্যান্ড ড্যাগার’ -এর সদস্য  হয়ে রক্তশপথ নিয়েছিলেন, তার মূল প্রেরণার উৎস যে তাদের পূজ্যপাদ পিতা মহাত্মা  কৃষ্ণধন ঘোষ, সে কথা উপলব্ধি করতে ইতিহাসবিদ হওয়ার প্রয়োজন হয় না। পিতার চরিত্রের এই দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও অকপটতার প্রভাব স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাত্র ছয় মাস পরে কে জি দেশপান্ডে সম্পাদিত ইংরাজি সাপ্তাহিক পত্রিকা বোম্বাই থেকে প্রকাশিত ‘ইন্দু প্রকাশ’-এ ‘নিউ ল্যাম্পস ফর ওল্ড ওয়ানস’ শীর্ষক অরবিন্দের ধারাবাহিক লেখার মাধমে প্রতিফলিত হয়। তৎকালীন জাতীয় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের তোষামোদী ও দুর্বল চারিত্র্যধর্মের বিরুদ্ধে এইসব আগুনঝরা  লেখায় মাত্র একুশবর্ষীয় অরবিন্দের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাহসিকতা ও মানীষার যে প্রকাশ আমরা লক্ষ করি তার নজির তৎকালীন ভারতের আর কারো লেখা বা চিন্তায় ছিল কিনা আমাদের জানা নেই। সে প্রসঙ্গ থাক।

 

মহকুমা খুলনা থেকে জেলা পর্যায়ে উন্নীত হয় ১৮৮২ সালে। এর ঠিক দশ বছর আগে কে ডি ঘোষ খুলনায় বদলি হয়ে আসেন সিএমও হিসাবে। তার জনপিয়তার কারণে ঈর্ষান্বিত ইংরেজ শাসক আজ ইতিহাসের অন্ধকূপে নিমজ্জিত; কিন্তু রংপুরের কে ডি ক্যানাল (যা পরবর্তীকালে সংস্কার করে দুর্ভগ্যজনকভাবে নামান্তরিত হয়েছে) এবং খুলনার কে ডি ঘোষ রোড এবং খুলনা জেলা পরিষদ ভবনের প্রবেশ পথে সুদৃশ্য ফোয়ারাটি, যা কে ডি ঘোষ-এর পুণ্যস্মৃতির উদ্দেশ্যে  উৎসর্গিত, তা শতাব্দীর বহু উত্থান-পতন, গ্রহণ-বর্জনের পর আজও স্মরণের আবরণে মরণের যত্নে ঢেকে রেখেছে। এ প্রসঙ্গে না বললেই নয়, ১৮৭২ সালেই, অর্থাৎ যে-বছর কে ডি ঘোষ খুলনায় বদলি হয়ে এলেন, কলকাতায় স্বর্ণলতা দেবীর এক বান্ধবীর বাড়িতেই ১৫ আগস্ট শ্রীঅরবিন্দের জন্ম হয়, এবং তার অব্যবহিত পরেই কে ডি ঘোষ সপরিবারে খুলনায় চলে আসেন।

 

খুলনায় আসার সাত বছর পর ১৮৪৯ সালে ডাঃ কৃষ্ণধন ঘোষ তিন পুত্রে শিক্ষার সুব্যবস্থার জন্য সপরিবারে ইংল্যান্ড যান। সেখানে তার একান্ত বন্ধু ড্রুয়েট পরিবারের উপর পুত্রদের শিক্ষার ভার অর্পণ করে দেশে ফিরে আসেন। ফেরার আগে বন্ধু ড্রুয়েট দম্পতিকে এই নির্দেশ দিয়ে আসেন যেন তার সন্তানেরা কোন ভারতীয়ের সাথে পরিচিত না হতে পারে বা তাদের মধ্যে  যেন কোন ভারতীয় প্রভাব প্রবেশ করতে না পারে। এবং এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়। সেদিন হয়ত ইতিহাস-বিধাতা অন্তরাল থেকে মৃদু হাস্য হেসেছিলেন। যে অরবিন্দ বা অরোকে নিয়ে পিতার অনেক স্বপ্ন ছিল সে আইসিএস অফিসার হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে, সেই অরোই পরবর্তীতে ‘plain living and high thinking’-এর সনাতনী ভারবর্ষীয় জীবনাদর্শের মূর্ত বিগ্রহ, ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির অনন্য ভাস্যকার এবং অধ্যাত্মতত্ত্বের এক নবভগীরথরূপে সমগ্র মানবজাতির পরিত্রাতার মর্যাদায় আজ অভিষিক্ত।

 

 

১৮৮২ সালে খুলনা জেলায় উন্নীত হবার পর ১৮৮৮ সালে ডাঃ কৃষ্ণধন ঘোষ খুলনা পৌরসভার প্রশত সরকার-মনোনীত চেয়ারম্যান হিসাবে অতিরিক্ত দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৮৯৩ সালে আকস্মিক মৃত্যু পূর্ব পর্যন্ত সে দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। খুলনার এই নতুন মর্যাদার ফলশ্রুতিতে ডাঃ ঘোষ সিএমও থেকে সিভিল সার্জন পদে অভিষিক্ত হন।

 

সুদক্ষ এবং উদারপ্রাণ চিকিৎসক হিসাবে জাতি-ধর্ম-নিবিশেষে আপামর জনগণের হৃদয়ের মানুষ হওয়া ছাড়াও মিউনিসিপ্যালিটির দক্ষ চেয়ারম্যান হিসাবে ডাঃ কে ডি ঘোষ অসাধারণ সাফল্যের নজির রেখেছিলেন। পৌর এলাকার ভৌত কাঠামো, বিশেষ করে রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য দক্ষ ও বলিষ্ঠ শ্রমিক এতদাঞ্চলে সহজলভ্য ছিল না সেদিন। এই সমস্যার সমাধানে ডাঃ ঘোষ সুদূর বিহার অঞ্চল থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহু আদিবাসী পরিবারকে, যারা এতদাঞ্চলে পরবর্তীতে ‘বুনো’ নামে পরিচিত, খুলনায় নিয়ে আসেন। কথিত আছে পথ্য হিসাবে গরুর দুধ সংস্থানে অক্ষম দরিদ্র জনের অসহায়ত্ব মোচনে তিনিই আশি তোলার পরিবর্তে একশত কুড়ি তোলায় সের-এর প্রচলন করেন এই খুলনায়। আমাদের শৈশবেও এই নিয়মটির প্রচলন ছিল। সে সময় খুলনার যাবতীয় সরকারী ও বেসরকারী কল্যাণ কর্মে ডাঃ কে ডি ঘোষ-এর উপস্থিতি ও সক্রিয় ভূমিকা ছিল পূর্বনির্ধারিত ও অপরিহার্য। পীড়াকাতর মানুষের রোগশয্যা এবং দরিদ্রনারায়ণের পর্ণকুটির থেকে সমাজের উচ্চতম পর্যায়ের সর্বত্র তার যাতায়াত ছিল অনায়াস, অবারিত ও নন্দিত। দারিদ্র্যজর্জর রুগীদের ঔষধ ক্রয়ের জন্য অর্থ দেওয়া ছাড়াও তাদের পথ্যের জন্য অর্থদান করতে গিয়ে প্রায়ই তার এমন অবস্থা হত যে সুদূর ইংল্যান্ডে শিক্ষারত সন্তানদের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় অর্থ তিনি মাসে পর মাস পাঠাতে পারতেন না শ্রীঅরবিন্দের স্কলারশিপের অর্থে তিন ভাই সে সময় কী নিদারূণ কষ্টে জীবন যাপন করতেন তার চমৎকার ও সরস বর্ণনা স্বয়ং শ্রীঅরবিন্দের লেখাতেই পাওয়া যায়। কেমব্রিজে যাওয়ার আগে একটি পুরো বছর তাঁকে একলা কাটাতে হয়েছিল লন্ডনে। নিজের সম্বন্ধে সরাসরি “আমি” না বলে উত্তম পুরুষে (third person-এ) তিনি লিখেছেনঃ “এই সময়টাতে তাঁকে খুবই দুঃখ ও দারিদ্র্য ভোগ করতে হয়েছে। গোটা একটা বছর ধরে তাঁকে কাটাতে  হয়েছে সকালে এক কাপ চায়ের সঙ্গে রুটি মাখন ও দুই টুকরা স্যান্ডউইচ মাত্র খেয়ে, আর সন্ধ্যায় এক পেনি মূল্যের সেভিলয় (saveloy)মাত্র, এই ছিল সারা দিনের খাদ্য ।“ চিন্তা করা যায়!! যার পিতা ব্রিটিশ ভারতের একটি জেলার এম .ডি ডিগ্রীধারী সিভিল সার্জন, তারই ছেলে, ভবিষ্যতে যার জন্মশতবার্ষিকী কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় গভীর শ্রদ্ধার সাথে পালন করবে, যার মানসসরোবর থেকে ইংরাজি ভাষায় রচিত বৃহত্তম ও মহত্তম মহাকাব্য  ‘সাবিত্রী’ উৎসারিত হবে, তাঁকে পুরো একটি বছর প্রচণ্ড শীতের মধ্যে সম্পূর্ণ অনাত্মীয় পরিবেষ্টিত লন্ডনের একটি দারিদ্র্যলাঞ্ছিত কক্ষে এই দৈন্যদশায় কাটাতে হয়েছিল। পিতা কৃষ্ণধন ঘোষ তো আদৌ অবিবেচক বা কান্ডজ্ঞানবর্জিত মানুষ ছিলেন না। তাহলে ? কীভাবে এটা সম্ভব হল ? এ প্রশ্নের একটি মাত্র উত্তর, যা আমদের আজকের ভোগবিলাসী মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত সমাজের আধিকাংশের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হবে না। অত্যন্ত দক্ষ ও দরদী চিকিৎসক হওয়ার কারণে তার চারিপাশে অজস্র দীনদরিদ্র রোগাক্রান্ত মানুষের নিত্যভিড় লেগেই থাকত, আর তাদের অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে এই মহদাশয় মানুষটি তার শেষ কর্পদকটি পর্যন্ত অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। তার সামনে সেদিন অন্য কোন বিকল্প ছিল না। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, তাই না ?।

 

কালের অলিন্দ পেরিয়ে যখন পেছনে দূর অতীতের আলো-আঁধারির পর্দার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি, তখন ধরে ধীরে বিস্মৃতির পর্দাটা ধীরে ধীরে অপসারিত হয়ে যায়, আর আমরা ক্রমশ এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ত্বটির সামনে এসে দাঁড়াই। একবার তাঁর দিকে দৃষ্টি মেলে আমরা শ্রদ্ধাবনত হই। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অতি দূর দিগন্ত থেকে সহসা ভেসে আসে আমেরিকার, তথা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঋষিতুল্য কবি, ওয়াল্ট হুইটম্যান-এর কম্বুকণ্ঠঃ

 

I do not make a little charity 

When I give, I give myself.” 

ডাঃ কে ডি ঘোষ ক্ষুদ্র দানের বেসাতি করেননি। তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিয়ে গেছের। তাঁর উদ্দেশ্যেও বলতে পারিঃ “এনেছিল সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ। মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।“ আর, তাই, যতদিন খুলনা নগরীর মানুষ ‘মানুষ’ থাকবে ততদিন ডাঃ কে ডি ঘোষ-এর নাম থাকবে ‘কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল।‘ 

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

অসিতবরণ ঘোষ 

অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ 

 

ফেইসবুকে খুলনাপিডিয়া

   

গণমাধ্যমে খুলনা পিডিয়া

Call for setting up IT village in Khulna

ডিজিটাল খুলনা উৎসব আজ

আজকের আবহাওয়া

খুলনা ডিরেক্টরি

খুলনার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের,যোগাযোগের ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল ঠিকানার ডাটা বেইজ সংরক্ষণ করা হবে ।

মানচিত্রে খুলনা

উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা

দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সংক্রান্ত তথ্য,বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য গবেষণা সংস্থারগবেষণাপত্র এই বিভাগে পাওয়া যাবে।