বিষয়সমুহ

 

 ইতিহাস 

   ইতিহাস ও ঐতিহ্য              মুক্তিযুদ্ধ     

  

শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি           গুণীজন

  

    জেলা প্রশাসন            স্থানীয় সরকার

 

 সরকারি দপ্তরসমূহ          শিক্ষা সংক্রান্ত

  

       কৃষি ও বন                 ভ্রমণ

  

 পরিবহন ও যোগাযোগ      অর্থ ও বানিজ্য

  

    সমাজ কল্যাণ              স্বাস্থ্য বিষয়ক

  

        গণ-মাধ্যম                 রাজনীতি 

               

                      অন্যান্য

বিবর্তনের ধারায় খুলনার ইতিহাস-ঐতিহ্য Print

বিবর্তনের ধারায় খুলনার ইতিহাস-ঐতিহ্য 

ড. শেখ গাউস মিয়া

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভাগ খুলনা। এ বিভাগের প্রধান জেলা খুলনা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বঙ্গোপসাগরের কূল জুড়ে এর অবস্থান। নদ-নদী বিধৌত, হযরত খানজাহান আলীর (রহঃ)-এর  পবিত্র পদচারণা-ধন্য, সুন্দরবনের অপরূপ শ্রীমন্ডিত এ জেলার আকার লম্বা আকৃতির, চৌকা ধরণের। এর উত্তরে অক্ষরেখা ২২০.৪৭ ও ২১০.৪০ এবং দ্রাঘিমা ৮১ ও ১০ । জেলার বাৎসরিক উষ্ণতা সর্বনিম্ন ১৫ ফারেনহাইট এবং সর্বোচ্চ উষ্ণতা ৪১ ফারেনহাইট। এখানকার আবহাওয়া আর্দ্র, শীত এবং গ্রীষ্মের তাপমাত্রার তারতম্য কম। বৃষ্টিপাত বেশি, দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনের অবস্থানের কারণে মৌসুমী জলীয় বাষ্প উভয় মৌসুমেই প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। আমরা এ জেলার অধিবাসী। তা আমাদের সত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কোন স্থানের ইতিহার ঐতিহ্য- অনুধাবনের ক্ষেত্রে নামকরণ তাৎপর্য নির্ণয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খুলনাও তার ব্যতিক্রম নয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ড. সুকুমার সেনের মতে খুলনা এসেছে “খুল্লনা” শব্দ থেকে যার অর্থ ক্ষুদ্র নৌকা ভাসে এমন স্থান। এক্ষেত্রে অনেক কিংবদন্তিও প্রচলিত আছে। এর একটা কিংবদন্তি হল খুলনা নামের উৎস খুল্লনেশ্বরী  দেবী  যিনি ধনপতি সওদাগরের স্ত্রী খুল্লনার স্মৃতিরক্ষার্থে ভৈরব নদ তীরের মন্দিরে ‌সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন, মুসলিম আমলের প্রথমদিকে আরব বণিকেরা এখানে প্রবেশ করে বলতো “আদ খোলনা”। এই “আদ খোলনা শব্দ থেকে খুলনা শব্দের উৎপত্তি। কিংবদন্তি হল বিপদাশংকা টের পেলে বনের দেবী বনবিবি বাওয়ালিদের বনে যেতে নিষেধ করে বলতেন “নৌকা খুলোনা”। এ “খুলোনা” থেকেই খুলনা শব্দটা এসেছে।এসব কিংবদন্তির সত্যাসত্য আজ আর যাচাই করার উপায় নেই। খুলনা শব্দের উৎপত্তির বিষয়ে আরও একটা সুত্র পাওয়া যায় ১৭৬৬ সালে পশুর নদীর দক্ষিণভাগে নিমজ্জিত “ফল মাউথ” নামক জাহাজের নাবিকদের রেকর্ড পত্র থেকে যেখানে খুলনাকে “কুলনিয়া” বা “কলনিয়া” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে খুলনা একটা জনবহুল জেলা হলেও এক সময় তা ছিল সুন্দরবন অংশ। বন কেটে আবাদ করা হয়েছে এবং জঙ্গল সরে গেছে। নতুন আবাদ বলেই খুলনার আর এক নাম নয়াবাদ। এ অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্য সুদূর অতীতে প্রসারিত। সমুদ্রগর্ভ থেকে অপেক্ষাকৃত পরে উত্থিত হলেও উপমহাদেশের অনেক স্থানের মত এখানেও প্রাচীনকালে জনবসতি স্থাপিত হয়েছিল বলে জানা  যায়। পাল আমলে পূর্ববঙ্গে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মত খুলানার জনসমাজও বৌদ্ধধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়। সেন আমলে তাদের প্রতিনিধি এ অঞ্চল তথা বুড়নদ্বীপ শাসন করতো। মুসলিম আমলে আসেন হযরত উলুঘ খান এ আজম খানজাহান তথা খানজাহান আলী (রহঃ) এ অঞ্চল আবাদ ও ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে যার  কৃতিত্ব সুবিদিত। এরপর নানা রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যে দিয়ে শাসনক্ষমতা চলে যায় বিদেশিদের  হাতে। তাদের দ্বারাই সারা দেশের মত এখানেও আধুনিক প্রশাসন ব্যবস্থার প্রচলন  ঘটে। খুলনা জেলার কেন্দ্রবিন্দু খুলনা। এখন যেখানে শহর এক সময় সে স্থান ছিল ক্ষুদ্র নৌবন্দর মাত্র। পূর্ববঙ্গ ও আসাম থেকে কলকাতার মধ্যে যাতায়াতের একটা সহজ পথ ছিল খুলনা হয়ে ১৮০১ সালে মিঃ চার্লস নামক জনৈক শ্বেতাঙ্গ নীলকর কর্তৃক এখানে একটা নীলকুঠি স্থাপিত হয়। তিনি তার কুঠির  পাশে একটা বাজার বসান যা বর্তমানে “বড়বাজার” নামে পরিচিত। ১৭৮১সালে তা একটা থানায় রূপান্তরিত করা হয়  ছিল নয়াবাদ থানা। এ নয়াবাদ অবস্থিত ছিল রূপসা নদীর ওপার। ১৭৮৬ সালে টিলম্যান হেঙ্কেলে সুপারিশ অনুসারে যশোরকে একটা জেলায়  রূপান্ততির করা হয়। এটিই বাংলাদেশের প্রথম জেলা। তখন খুলনা ছিল এ জেলার অন্যতম থানা। ১৮৪২ সালে খুলনা মহকুমায় রূপ লাভ করে। বলা হয় শ্বেতাঙ্গ অত্যাচারী জমিদার রেণীকে ইংরেজ শাসনাধীনে আনাই ছিল এ মহকুমা স্থাপনের উদ্দেশ্য। এর প্রথম  মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট হন এইচ, এস, শ্। এটাই খুলনা প্রত্যক্ষ ইংরেজ শাসনে সূত্রপাত। খুলনা বাংলার প্রথম মহকুমা।১৮৬১সালে ২৪ পরগণা জেলার অধীনে সাতক্ষীরা মহকুমার সৃষ্টি হয়। ১৮৬৩ সালে বাকরগঞ্জ জেলা কচুয়া এবং মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলাকে নিয়ে যশোর জেলার অধীনে বাগেরহাট মহকুমার পত্তন ঘটে। এতদিন তা ছিল খুলনা মহকুমার অধীনে একটা থানা মাত্র। এর ২০ বছর পরে সুন্দরবন আবাদ বৃদ্বি, তার সম্পদ রক্ষা এবং কোম্পানীর স্বার্থরক্ষার জন্য বঙ্গীয় সরকার খুলনাকে কেন্দ্র করে ভিন্ন জেলা গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকে। তখন ১৮৮২ সালে জেলার মধ্য থেকে খুলনা ও বাগেরহাট মহকুমা এবং ২৪ পরগনা থেকে সাতক্ষীরা কালীগঞ্জ এবং বসন্তপুর নিয়ে এ জেলা গঠিত হয়। জেলা হওয়ার সময় নড়াইলের অংশটুকু খুলনা  থেকে বাদ দিয়ে যশোর জেলায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তখন এ জেলার আয়তন হয় ৪৬৩০ বর্গমাইল লোকসংখ্যা ৪৩,৫০০ জন।১৮৮২ সালের ২৫ শে এপ্রিল এ নতুন জেলার গেজেট নটিফিকেশন হয়। ওই বছরের ১ জুন থেকে জেলার কাজ  আরম্ভ হয়। নতুন জেলার নাম রাখা হয় খুলনা জেলা। এর সদর খুলনা  জেলার প্রথম ম্যাজিষ্ট্রেট হন মিঃ ডব্লিউ এম ক্লে। এরপর জেলার  লোকসংখ্যা যেমন বাড়তে থাকে তেমনি তার কেন্দ্রবিন্দু খুলনা শহরেরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। ১৮৮৪ সালে খুলনা পৌরসভা গঠিত হয়। খুলনা ছিল এ জেলার তৃতীয় পৌরসভা। প্রথম পৌরসভা হয় সাতক্ষীরা। দ্বিতীয় পৌরসভা হয় দেবহাটা যা পরে ইউনিয়ন বোর্ডে পরিণত হয়। খুলনা পৌরসভা গঠনের উদ্দেশ্যে ১৮৮৪ সালের ১৮ই মে এক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় এবং তা কলকাতা গেজেটে প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে অবিভক্ত বাংলার লে. গভর্ণরের ঘোষণা অনুসারে খুলনা জেলার খুলনা শহর এলাকার কয়লাঘাটা ও হেলাতলা  সহ বানিয়াখামার, টুটপাড়া, গোবরচাকা, শেখপাড়া, নূরনগর শিববাটি ও ছোট বয়রাকে নিয়ে একটা দ্বিতীয় শ্রেণীর পৌরসভা গঠনের কথা বলা হয়। এর পরের দু’টি বড় ঘটনা হল  কেডিএ স্থাপন এবং খুলনা বিভাগ ঘোষণা। ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণরের এক অর্ডিন্যান্স বলে খুলনা শহরের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে খুলনা উন্নয়ন সংস্থা তথা কেডিএ গঠিত হয়। এ স্বায়ত্তশাসিত  সংস্থা গঠনের মধ্য দিয়ে খুলনা শহর সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা ঘটে । একই বছর আর একটা ঘটনা ঘটে যা খুলনা ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করে। তাহল খুলনাকে আলাদা বিভাগ হিসেবে ঘোষণা দেয়া। ১৯৬১ সালে খুলনা বিভাগের রূপ লাভ করে এবং তার বিভাগীয় সদর দপ্তর স্থাপন করা হয় শহরের নূরনগর নামক স্থানে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে বৃটিশ আমলে জেলাগুলো ভেঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জেলায় পরিণত হয়েছে। পূর্বের খুলনা জেলা এখন তিনটি জেলায় বিভক্ত। তখনকার সদর মহকুমা পরিণত হয়েছে আজকের খুলনা জেলায়। বাকী দু’টি মহকুমা এখন পৃথক দু’টি জেলা। তা হলো বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা।

খুলনা জেলার পরিচয় প্রসঙ্গে প্রথমে সংক্ষেপে এখানকার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে দৃষ্টিপাত করা যায়। খুলনার ইতিহাস সংগ্রামী মানুষের ইতিহাস। এ সংগ্রামের ঐতিহ্য বিশ শতকের সূচনাকাল  পর্যন্ত প্রসারিত। ভারতীয় কংগ্রেস গঠিত হবার পর এ জেলার বহু মানুষ তাতে যোগ দেয় এবং বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঢাকা চট্রগ্রামের মতো বিপ্লবতীর্থ না হয়ে ওঠলেও  বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে খুলনা সংবাদ শিরোনাম হয়ে ওঠেছে বার বার। ১৯০৫ সালের ১৬ জুলাই বঙ্গভঙ্গ রদ-এর বিষয়ে প্রথম সভা  বাগেরহাটে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর “বাংলাদেশের ইতিহাস” চতুর্থ খণ্ডে যার উল্লেখ করেছেন। এতে সভাপতিত্ব করেন দেবীবর চট্রোপাধ্যায়। এরপর এ আন্দোলনে চলতে থাকে এবং এ বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন নতুন  মাত্রা অর্জন করে। এতে স্থানীয় কংগ্রেস নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মত। কলকাতা অতি কাছে স্থান হবার কারণে তা সব সময়ই ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে মুখর। কংগ্রেসের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি যে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে শুরু হয় তাতেও এখানকার মানুষ পিছিয়ে থাকেনি। ১৯০৮ সালে সংঘটিত আলীপুর বোমা হামলা মামলায় যে ৩৮ জনকে আসামী করা হয় তাঁদের মধ্যে ৩ জন ছিলেন খুলনার। এদের মধ্যে একজন  ইন্দুভূষণ যিনি আন্দামান কারাগারে আত্মহত্যা করেন। ১৯০৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আলীপুর চৌহদ্দীর মধ্যে পাবলিক প্রসিকিউটর আশুতোষ ভট্টচার্যকে গুলী করে হত্যা করেন চারুচন্দ্র বসু। তাঁর বাড়ি ছিল খুলনার ডুমুরিয়ায়। বিচারে চারুচন্দ্রের মৃতুদণ্ড হয়। ১৯২১ সালে স্থানীয় কংগ্রেস নেতা যামিনীরঞ্জন মিত্রের উদ্যোগে খুলনার খালিশপুরে স্বরাজ আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্রমে তু গান্ধীবাদী নীতি-আর্দশ প্রচার ও কাজকর্মের প্রাণকেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। পরে তা ” খুলনার সবরমতি আশ্রম’’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ১৯২৫ সালের ১৭ জুন মহাত্মা গান্ধী খুলনায় আসেন। এখানে পৌরপার্কে তিনি ভাষণ দেন বলে তার নাম হয়ে যায় “গান্ধীপার্ক”। এ আন্দোলনে আরও যোগ দেন সেনহাটির তৎকালীন ছাত্রনেতা প্রফুল্লচন্দ্র সেন। তিনি পরে “আরামবাগের গান্ধী” নামে পরিচিত হন এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হবার গৌরব অর্জন করেন। তিরিশের দশকের শুরুতে খুলনার বিপ্লবীদের দ্বারা কয়েকটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। এর একটা ছিল পুলিশ কমিশনার টেগার্টের ওপর আক্রমণ। এ আক্রমণ চালান সেনহাটির তনুজাচরণ  সেন। আর এক বোমা হামলা অভিযানে নেতৃত্ব দেন বিখ্যাত ঐতিহাসিক “যশোহর খুলনার ইতিহাস” গ্রন্থের রচয়িতা সতীশচন্দ্র মিত্রের পুত্র শিব শংকর মিত্র। ১৯৩২ সালে সেনহাটির আর এক বিপ্লবী অতুল কুমার সেন রিভলবারে গুলি চালিয়ে ওয়াটসনকে হত্যার প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। ১৯৩৭ সালে খুলনায় কমিউনিষ্ট পার্টির শাখা স্থাপিত হয়। এতে বৈপ্লবিক আন্দোলনে আরো গতি আসে। ১৯৩৯ সালে সুভাষ বসু  কংগ্রেস ত্যাগ করে ফরোয়ার্ড  ব্লক গঠন করেন। এ উপলক্ষে তিনি খুলনা আসেন । এর পূর্বেও তিনি দু’বার খুলনায় এসেছিলেন। পাশাপাশি এখানে ব্যাপক কৃষক বিদ্রোহের ঘটনাও ঘটে যার নেতৃত্ব দেন শচিন বসু ও বিষ্ণু চ্যাটার্জী। তাঁদের উদ্যোগে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামী কৃষকদের সাথে স্থানীয় জমিদাদের লাঠিয়াল বাহিনীর কয়েকবার রক্তাক্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করে। তাঁদের প্রচেষ্টায় ফকিরহাটের মৌভোগ এবং ডুমুরিয়ার শোভনায় কয়েবার বিরাট কৃষক সম্মেলন হয়। এতে যোগ দেন সর্বভারতীয়  বড় বড় কৃষক নেতারা। একবার আসেন যুবক কমিউনিস্টি নেতা জ্যোতি বসু। মৌভোগ সম্মেলনকে অবলম্বন করে বিখ্যাত কবি বিষ্ণু দে রচনা করেন তাঁর সাড়া জাগানো কবিতা “মৌভোগ’’ যা ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত “বিষ্ণুদের শ্রেষ্ঠ কবিতা”, পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণে স্থান পেয়েছে। আরও অনেক ঘটনা ঘটে। এভাবে এসব বিদ্রোহ-বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এখানকার শ্রমজীবী সমাজ যে সংগামী ঐতিহ্য সৃষ্টি করে যা আজো ইতিহা হয়ে আছে।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর দু’টি ঘটনা আমাদের ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে। তা হল ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ। ভাষা আন্দোলন আমাদের পূর্ববঙ্গবাসীদের প্রথম স্বাধিকার আন্দোলন। এ আন্দোলনে সিঁড়ি বেয়েই ৬৬-এর শিক্ষার আন্দোলন, উনসত্তরের গণ- আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন এবং সর্বশেষে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটা স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ভাষা আন্দোলনে খুলনার মানুষ পিছিয়ে থাকেনি। তারা এ আন্দোলনে নামে কোন কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়াই সম্পুর্ণ নিজস্ব স্বতঃস্ফুর্ত উদ্যোগে। আটচল্লিশে খুলনার ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল দৌলতপুর কলেজ তথা বর্তমানে বি.এল কলেজ। এ কলেজের ছাত্র ফেডারেশন ও মুসলিম ছাত্রলীগের ছাত্ররাই এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। এর মধ্যে স্বদেশ বসু, সন্তোষ দাসগুপ্ত, ধনঞ্জয় দাস, তাহমিদ উদ্দিন, জিল্লুর রহমান, মতিয়ার রহমান প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। তাঁরা ১১ মার্চ সফল ধর্মঘট পালন করেন এবং নানা কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে এ আন্দোলনকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে সমর্থ হন। ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার কারণে খুলনার বিশিষ্ট ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন গ্রেফতার হন এবং ১৯৫০ সালে ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলার খাপরা ওয়ার্ডে অন্যান্যদের সাথে পুলিশের গুলীতে নিহত হন। পুলিম দৌলতপুর কলেজের ছাত্র ডুমুরিয়ার স্বদেশ বসুকেও গ্রেফতার করে এবং ৭ বছর বন্দী করে রাখে। ১৯৫৫ সালে তিনি মুক্তি পান। বায়ান্নোর ভালা আন্দোলনেও খুলনা অগ্নিগর্ভ হয়ে পড়ে । এবার তার ব্যাপকতা ছিল আরো বেশি। প্রাথমিক অবস্থায় শুধু ছাত্রদের সূচিত হলেও পরে সর্বস্তরের জনগণ তার সাথে যুক্ত  হয়ে যায়। তারা একে তাদের ওপর পাক সরকারের নিপীড়ন ও শোষণের প্রতিবাদ হিসেবে দেখতে থাকে। কেন্দ্রের নির্দেশে এখানে গঠিত হয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদ যাতে ছিলেন আব্দুল গফুর, আবু মোহাম্মদ ফেরদাউস, এম এ বারী, আবুল কালাম সামসুদ্দিন, এম নূরুল ইসলাম সমীর আহমদ প্রমুখ। ভাষার দাবিতে ঢাকার বাইরে যে সব স্থানে জোরদার আন্দোলন হয় তার মধ্যে একটা ছিল খুলনা। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে কয়েকজন বিরোধীপক্ষের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতও হন। এর মধ্যে আবু মোঃ ফেরদাউস-এর নাম উল্লেখ করা যায়। সমীর আহমদ সম্পাদিত খুলনার “সবুজ পত্র” পত্রিকাটিও ভাষার দাবি প্রচারের ক্ষেত্রে কার্যকর্র ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া ১৯৫২ সালে কিছু সংখ্যক তৎকালীন ছাত্রীদেরও বিশেষ ভূমিকা ছিলো।

এরপর ৬৯ সাল। এ বছরই স্বৈরাচারের শৃঙ্খল ছিহ্ন করবার প্রয়াসে এক অভূতপূর্ব উন্মাদনায় জেগে ওঠে সমগ্র জাতি। খুলনার মানুষও তাতে সাড়া দেয় ব্যাপকভাবে যা অচিরেই রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। তারই পথ ধরে আসে মুক্তিযুদ্ধ। এ যুদ্ধে অংশ খুলনার মানুষের অবদান ছিল অসামান্য। ২৫শে মার্চের পর প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিয়ে খুলনার মুক্তিযোদ্ধারা যে বীরত্বের পরিচয়  দেয় তা যুগ যুগ ধরে বাঙালি জাতির কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। প্রতিরোধ পর্ব অতিক্রান্ত হবার পর মুক্তিযোদ্ধারা ট্রেনিং নিয়ে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে দলে দলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়তে থাকলে প্রতিরোধ প্রয়াস পরিণত হয়ে যায় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে। এ জেলার এক বড় অংশ ছিল নবম সেক্টরভুক্ত। এ সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর এম এ জলিল। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস এখানে অনবরত যুদ্ধ চলে। এখানে যেমন হয় গেরিলা যুদ্ধ, তেমনি হয় সম্মুখ সময়। ভয়াবহ ট্যাংক যুদ্ধও হয় এখানে। এ যুদ্ধে এখানে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যা সহজে  চোখে পড়ার মত। প্রথমতঃ খুলনার সাতক্ষীরা থেকে ব্যাংক অপারেশনের মাধ্যমে উদ্বারকৃত এক কোটি পঁচাত্তর লাখ টাকা নিয়েই নবগঠিত বাংলাদেশ সরকার তার যাত্রা শুরু করে। দ্বিতীয়তঃ c/2 p ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেয়া নৌ-কমান্ডোরা দুঃসাহসিক নৌ-অভিযান চালিয়ে জাহাজডুবি ঘটিয়ে মংলা বন্দর সম্পূর্ণ অকেজো করে দেয় যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের একটা সাড়া জাগানো ঘটনা। তৃতীয়তঃ এখানে শিরোমণি নামক স্থানে সংঘঠিত হয় ঐতিহাসিক ট্যাংক যুদ্ধ যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটা অনন্যসাধারণ ঘটনা। চতুর্থরঃ খুলনা এমন  একটা স্থান যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ভারতীয় বিমানের আঘাতে ধ্বংস হয় বাংলাদেশের যুদ্ধজাহাজ যে ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনার সাথে যুক্ত থেকে শহীদ হন  বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন। রুপসা নদীর পূর্বপাড়ে তার কবর রয়েছে। খুলনা স্বনামধন্য মুক্তিযোদ্ধদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য  হলেন এম এ গফুর, লে.রহমতউল্লাহ দাদু বীরপ্রতীক, সামছুল আরেফিন, কামরুজ্জামান টুকু, স ম বাবর আলী, অধ্যাপক আবু সুফিয়ান, শেখ ইউনুচ আলো ইনু, জাহিদুর রহমান জাহিদ, শেখ আবদুল কাইয়ুম, খিজির আলী বীর প্রতীক, মীর্জা খায়বার হোসেন প্রমুখ।

এবার এ জেলার অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর আলোকপাত করা যায়। সারা দেশের মত এ জেলার অর্থনীতি ও বহুপূর্ব থেকেই কৃষি নির্ভর। বিশ শতকের তৃতীয় দশকের পূর্ব পর্যন্ত এখানে কোন বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। কৃষিই ছিল অর্থনীতির মূল ভিত্তি। প্রধান ফসল ছিল ধান। এর উৎপাদনের পরিমাণও ছিল বেশি। ইংরেজ আমলে বরিশালকে যে “শস্য ভাণ্ডার” বলা হত খুলনারও তার বাইরে ছিল না। শুধু ধান নয়- এ জেলা আরও কিছু কৃষিজাত পণ্যের  জন্য বিখ্যাত ছিল। যেমন নীল, পাট, সুপারি গুড়, চিনি, নারকেল, তামাক প্রৃতি। এসব দ্রব্যসামগ্রী স্থানীয় প্রয়োজন মিটিয়ে বাইরেও চালান যেত। আর উৎপাদিত হতো লবণ। জেলা বিভিন্ন স্থানে লবণ তৈরি হলেও তার প্রধান অফিস অবস্থিত ছিল খুলনার কয়লাঘাটায়। এর নাম ছিল “নিমক চৌকি”। মোরেলগঞ্জেও একটা  লবণ অফিস বসানো হয়েছিল বলে জানা যায়। শিল্প বলতে ছিল প্রধানত কুটির শিল্প। তা জেলার অর্থনীতিরতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। হিন্দু সমাজের বর্ণাশ্রম প্রথা দ্বারা বিন্যস্ত সমাজের একটা বিশেষ শ্রেণী তথা পেশাজীবীরা এসব কাজে নিয়োজিত থাকতো। এসব কৃষি ও শিল্পজাত পণ্যের কেনাবেচার বড় কেন্দ্র ছিল স্থানীয় হাট-বাজারগুলো। এর অনেকগুলো টিকে আছে আবার অনেকগুলো হারিয়ে গেছে। আর বিক্রি হত বিভিন্ন পূজা-পার্বণ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন মেলায়। এক একটা মেলা ছিল কুটির শিল্পজাত পণ্যের এক একটা বড় প্রদর্শনী। এক্ষেত্রে সুন্দরবনের  কথাও উল্লেখযোগ্য করা যায়। পূর্বেই বলেছি জেলার এক বড় স্থান জুড়ে রয়েছে সুন্দরবন। সৌন্দর্যের সাথে সাথে পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের জন্য এ বন বিখ্যাত। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হল উদ্ভিদ ও প্রাণিকূলের ব্যাপক বৈচিত্র্যময়তা। অর্থনৈতিক তৎপরতা বিকেন্দ্রীভূত হবার পর্যন্ত এখানকার অর্থনৈতিক কাজকর্মের এক বড় উৎস ছিলো এ সুন্দরবন।। মাছ কাঠ মধু গোলপাতা প্রভৃতি আহরণ ছিলো অনেকের জীবিকা-নির্বাহের প্রধান উপায়। ১৮৮৪ সালের পর অর্থনীতি তথা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। এ বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারী কলকাতা-খুলনা রেলপথ চালু হয়। এর পেছনে ছিল তৎকালীন বৃটিশ সরকারের বাণিজ্যক স্বার্থ। কলকাতা পাটকলের কাঁচামাল পরিবহনের জন্য তা স্থাপন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এ লাইন স্থাপিত হলে এখানে দলে দলে সূক্ষ্ম ব্যবসায়িক বুদ্ধি-সম্পন্ন মাড়োয়ারীরা আসতে থাকে এবং নানা ধরণের বাণিজ্যক কর্মকাণ্ডে খুলনাকে মুখরিত করে তোলে। এর মধ্যে বড় ছিলো পাটের ব্যবসা। খুলনার প্রথম বৃহৎ শিল্প বাগেরহাট টেক্সটাইল মিল স্বদেশী আন্দোলনের ধারায় যা ১৯১৮ সালে স্থাপিত হয়। দ্বিতীয় উদ্যোগ খুলনা টেক্সটাইল মিল খুলনা শহরের বয়রা নামক স্থানে ১৯৩১  সালে যার দ্বারোদঘাটন করা হয়। এ মিলগুলো স্থাপনে বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল। এজন্য খুলনা টেক্সটাইল মিলটির নাম রাখা হয় “আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র কটন মিল” তথা সংক্ষেপে এপিসি কটন মিল। এ মিলগুলো খুলনার অর্থনীতির ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করে। এতে খুব উন্নতমানের কাপড় উৎপাদিত হতো সারা ভারতে যার ব্যাপক চাহিদা ছিলো।

১৯৪৭ সালের পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। কলকাতা সাথে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে কলকারখানা স্থাপন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সুন্দরবন কাছে থাকায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হবার এক্ষেত্রে খুলনা একটা আদর্শ স্থান বলে বিবেচিত হতে থাকে। ১৯৫০ সাল থেকে ভৈরব ও রূপসা নদীর তীর ধরে গড়ে ওঠে ছোট বড় অনেক কলকারখানা। এর মধ্যে রয়েছে পাটকল, নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল, ক্যাবল ফ্যাক্টরি প্রভৃতি। ১৯৫৪ সালে খুলনার মংলা নামক স্থাপিত হয় দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মংলা যা খুলনা সহ সারাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করে। দেশে বর্হিবাণিজ্য আজ অনেকাংশে মংলার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে দেশের অন্যান্য অনেক স্থানের মত খুলনাতেও কৃষিপণ্য হিসেবে পাদ প্রদীপের আলোয় ওঠে এসেছে একটা নতুন জিনিস। তাহল চিংড়ি মাছ যা আজ “সাদা সোনা” বলে পরিচিত। এটা বর্তমানে আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক বড় অবলম্বন। ভৌগলিক অবস্থার ভিন্নতার কারণে এখানে মাছের নাম ও উৎপাদনের পরিমাণ অনেক উন্নত। এ হিমায়িত কারখানা। যার সংখ্যা শতাধিক তো হবেই। তা এখন এখানকার অর্থনৈতিক জগতকে প্রাণচঞ্চল করে রেখেছে।

এরপর শিক্ষা বিস্তার প্রসঙ্গে আসা যেতে পারে। উনবিংশ শতাব্দিতে ইংরেজ শাষনের মূল কেন্দ্র ছিলো কলকাতা। সেখানে আধুনিক শিক্ষার প্রচলন ঘটে গিয়েছিলো অনেক আগেই। তার প্রভাব মফস্বল শহরগুলোতে পড়েছিল ধীরে ধীরে। বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত হচ্ছিল স্কুল কলেজ। এ প্রভাবে স্থাপিত খুলনার প্রথম স্কুল হল দৌলতপুরে স্থাপিত মোহসিন স্কুল যা ১৮৬৭ সালে তার যাত্রা শুরু করে। অবশ্য এর আগেই সাতক্ষীরায় প্রাণনাথ হাইস্কুল ও বাগেরহাটের বাগেরহাট হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। এরপর স্থাপিত উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হল জিলা স্কুল যা ১৮৮৫ সালে স্থাপিত হয় খুলনা শহরে। ১৯১৩ মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় করোনেশন স্কুল। ১৯০২ সালে ব্রজলাল শাস্ত্রীর প্রচেষ্টায় দৌলতপুরে ভৈরব নদের তীরে গড়ে ওঠে হিন্দু একাডেমী অচিরেই যা কলেজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। খুলনার প্রথম মাদ্রাসা ইউসুফিয়া মাদারাসা, প্রতিষ্ঠা সাল ১০৯২। লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জেলার কাজকর্ম আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। শিক্ষার চাহিদা মেটানোর উদ্দোশ্যে স্থাপিত হতে থাকে আরও স্কুল কলেজ। জেলা শহরে ও গ্রামাঞ্চলে গড়ে ওঠে নানা শ্রেণীর অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭১ সালের পর তার সংখ্যা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে এখানকার সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য সংযোজন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও ১৯৯০ সাল পর্যন্ত খুলনায় কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছিলনা। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী জনগণ ও বিভিন্ন সংগঠনের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও জোরালো দাবির মুখে ১৯৯০-৯১ শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৪টি ডিসিপ্লিনে ৮০ জন ছাত্র নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে। শুরু হয় নতুন ইতিহাস। বর্তমানে জেলায় মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা ৩৯৫ ও ৪৫৫। ৬টি কলেজসহ জেলায় মোট কলেজের সংখ্যা ৯২।

সাহিত্য-চর্চাতেও খুলনা সুমহান ঐতিহ্যের দাবিদার। আধুনিক যুগে এখানকার গ্রামঞ্চলে প্রচলিত ছিলো ছড়া গান, ধাঁধা, প্রবাদ তথা নানা ধরণের লোক সাহিত্য। শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী বাংলা একাডেমীর বিভিন্ন সংগ্রাহক ও নূর মোহাম্মদ টেনার উদ্যোগে এর কিছু কিছু সংগৃহীত হয়েছে। এখনও যা সংগ্রহেরবাইরে আছে তার সংখ্যাও কম নয়। আধুনিক যুগের কবিসাহিত্যিকদের মধ্যে প্রথমে সেনহাটি নিবাসী “সদ্ভাব শতক” এর কবি হিসেবে পরিচিত কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের নাম উল্লেখ করা  যায়। কবি এবং সম্পাদক হিসাবে সে যুগে তিনি ছিলেন খুবই বিখ্যাত। আর একজন প্রতিথযশা সাহিত্য ব্যক্তিত্ব কাজী ইমদাদুল হক যিনি একমাত্র “আব্দুল্লাহ” উপন্যাসের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন দখল করে নিয়েছেন। খুব বিখ্যাত না হলেও মুন্সী খয়রাতুল্লাহ, মেরাজ উদ্দিন, মেছের উদ্দিন কবিরাজ, সফিউদ্দিন আহমদ, কাজী আকরাম হোসেন, ডাঃ আবুল কাসেম, বিধুভূষণ বসু, নিশিকান্ত বসু রায, ভুপেশচন্দ্র আহচ, দবির উদ্দিন আহম্মদ, আজমল হোসেন, আব্দুল ওহাব সিদ্দিকী, মান কুমারী বসু, প্রমুখের নাম স্মরণযোগ্য। আধুনিক ভাব ধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে পরে এ জেলার যারা সাহিত্য চর্চায় আত্মনিয়োগ করে বিশেষ প্রসিদ্ধি অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মোঃ ওয়াজেদ আলী, শচীন সেনগুপ্ত, সিকান্দার আবু জাফর, আনিস সিদ্দিকী, সতীশচন্দ্র মিত্র প্রমুখ। সাম্প্রতিক কালের বিখ্যাতরা হলেন হাসান আজিজুল হক, নীলিমা ইব্রাহীম, মুহম্মদ আবু তালিব, ড.হালিমা খাতুন, আবুল হোসেন, বেদুঈন রফিক প্রমুখ। এখনও বহু কবি সাহিত্যিক আছেন যাঁরা নিয়মিত লিখে চলেছেন। এঁদের অনেকে সম্ভাবনাময় সাহিত্য প্রতিভার অধিকারী। তাঁদের প্রত্যেকের নামোল্লেখ একটা স্বতন্ত্র গ্রন্থের পরিসর দাবি করে।

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও খুলনার মানুষের পিছিয়ে থাকেনি কখনও। তখন বাংলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো কলকাতা। আর কোলকাতার অতি কাছের জনপদ হওয়ায় এখানকার সাংস্কৃতিক  কর্মকাণ্ডের ওপর কলকাতার প্রভাব ছিল বেশি। খুলনার সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রসঙ্গে প্রথমে শতাব্দি প্রাচীন নাট্য সংগঠন নাট্য নিকেতনের কথা উল্লেখ করা যায় এর সূচনা ঘটে ১৯০০ সালে। এ হিসাবে এখন এর বয়স হলো ১০৮ বছর। প্রথমে এর নাম ছিল খুলনা থিয়েটার। পরে নাট্য মন্দির এবং সবশেষে তা বর্তমান নাম নাট্য নিকেতন এসে দাঁড়ায়। ১৯১১ সালে এর জন্য ভবন নির্মিত হয় যার দ্বারোদঘটন করেন তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বার্ডলি বার্ড। ভবনটি  বর্তমানে “করোনেশন হল” নামে পরিচিত যেখানে বর্তমানে সিনেমাও দেখনো হয়ে থাকে। পরে নাট্য নিকেতনের পাশাপাশি আরও অনেক নাট্য সংগঠন গড়ে ওঠেছে। যেমন, রূপান্তর নাট্য গোষ্ঠী, খুলনা থিয়েটার, সন্ধানী নাট্যগোষ্ঠী ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন কেন্দ্র সংক্ষেপে লোসাউক প্রভৃতি। শুধু নাটক নয়- সাহিত্য ও সঙ্গীত চর্চার উদ্দেশ্যেও এখানে অনেক সংগঠন গড়ে ওঠেছে। তারা নানা অনুষ্ঠানাদির ভিতর দিয়ে একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলায় সচেষ্ট থেকেছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে জুগিয়ে এসেছে প্রেরণার রসদ। যেমন রেলওয়ে ইনস্টিটিইটি, তমুদ্দন মজলিস, তরুণ সংঘ, সাংস্কৃতিক সংসদ, নয়া সাংস্কৃতিক সংসদ, সাংস্কৃতিক মজলিস, খুলনা একাডেমী অব ফাইন আর্টস, পল্লীমঙ্গল আর্ট সেন্টার, সাহিত্য মজলিস, সাহিত্য শিল্প সংকেত, অগ্রণী শিল্পী সংসদ, বিকিরণ, খুলনা সাহিত্য পরিষদ, সন্দীপন উদীচী, স্কুল অব মিউজিক, কবিতালাপ, ছড়াসংসদ, বিকিরণ, খুলনা সাহিত্য সাংস্কৃতিক  সংস্থা, প্রতিনিধি সংস্কৃতিক  সংস্থা, চারণিক শিল্পগোষ্ঠী, নান্দী দক্ষিণ বাংলা সাহিত্য কেন্দ্র সৃজন সংস্কৃতি সংস্থা, রেঁনেসা সাহিত্য সংসদ, সাহিত্য সমাজ প্রভৃতি। এদের কিছু টিকে আছে আবার কিছু হারিয়ে গেছে। তবে আয়ু যাই হোক সাফল্যে ব্যর্থতায় আপ তারা ইতিহাসের অঙ্গ। সঙ্গীত চর্চায় খুলনায় যাঁরা খ্যতিমান তাঁদের মধ্যে অপেক্ষকৃত প্রবীণেরা হলেন, ধীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী, মুন্সী রইসউদ্দিন, ইন্দূভূষণ ঘোষালা, শুকলার চক্রবর্তী প্রমুখ। দ্বিতীয় সারিতে রয়েছেন ওস্তাদ শামসুদ্দীন আহমদ, সাধন সরকার, বিনয় রায়, কালিপদ দাস, নাসির হায়দার, আব্দুল মালেক চিশতি, রাশেদ উদ্দীন তালুকদার, অনিমেষ চক্রবর্তী, আলী আহমদ প্রমুখ। এখন যারা সঙ্গীত চর্চায় রত আছেন তাদের সংখ্যাও অনেক। এদের অনেকের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাবনাময়।

খেলাধূলাতেও খুলনার গৌরবময় ঐতিহ্য বর্তমান। ১৯১০সালে জেলা ক্রীড়া সংস্থা গঠিত হয় বলে জানা যায় । বিভাগ-পূর্ব যুগে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেল ছিলো ফুটবল। এক্ষেত্রে তিনটি ক্লাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্লাবগুল হল টাউন ক্লাব, মুসলিম স্পোর্টি ক্লাব এবং ইউনিয়ন স্পোর্টিং ক্লাব। এসব ক্লাবে যাঁরা খেলতেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ক্যাপ্টেন সাত্তার, ফজলে আকবর, এ বারি, মাহবুব খান, খান এ সবুর, এ রউফ, কিসমত-উল হাকিম, ওয়াছিকুর রহমান, আবুবকর, মোঃ আমিন, ফকরুদ্দীন আহমদ প্রমুখ। চল্লিশের দশকে ফুটবল খেলা কতটা ব্যাপকতা অর্জন করে তার পরিচয় পাওয়া যায় কলকাতায় অনুষ্ঠিত আই এফ এ শিল্ডের খেলায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশ বিভাগের পর স্থানীয় লীগ জমে ওঠে। এসময় খুলনার ১০/১২টি দলের সাথে আর যে দলটি অংশ নিত সেটি হলো ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। ১৯৭১ সালের পর খুলনার যাঁরা নন্দিত ফুটবলার হিসেবে পরিচিতি পান তাঁরা হলেন- আসলাম, সালাম, জসি ও রুমি রিভজী করিম। এঁরা জাতীয় দলের খেলোয়াড় ছিলেন।

পাকিস্তান আমলে খুলনার ক্রিকেট অঙ্গনে অবাঙালিদের প্রাধান্য ছিল বেশি। যেসব ক্লাব এক্ষেত্রে অগ্রগামী ভুমিকা পালন করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল খুলনা ক্লাব, মুসলিম স্পোর্টিং ক্লাব, খুলনা হিরোজ প্রভৃতি। খেলা হতো সার্কিট হাউজ মাঠে। ১৯৭১ সালে পূর্বেই খুলনায় ক্রিকেট লীগ শুরু হয়। যাঁদের চেষ্টায় খুলনায় আধুনিক ক্রিকেটের প্রাণসঞ্চার ঘটে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আতাউর হক মল্লিক ও কাজী আমানুল হক। তরুণদের  মধ্যে ক্রিকেট খেলার নাম যে কতখানি উন্নত তার পরিচয় পাওয়া যাবে ১৯৮৬ সালে জাতীয় যুব ক্রিকেট খুলনার দ্বিতীয় স্থান অর্জনের করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরা হলেন শেখ সালাউদ্দীন, মঞ্জরুল ইসলাম, কাজী মঞ্জুরুল ইসলাম (সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত), আব্দুর রাজ্জার রাজ প্রমুখ। এ্যাথলেটিক্স-এর চর্চাতেও খুলনার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। এ্যাথলেটদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, আমজাদ হোসেন, খান মহুর, মোস্তাফিজুর রহমান, এনামুল হক, আব্দুস সাত্তার খান, ফজলুল হক প্রমুখ। দেয়েদের মধ্যে রয়েছে মেরিনা খাতুন, কাজী সিতারা জামান, লাভলী বেগম প্রমুখ। বডি বিলডিং-এ খুলনার এক অবিস্মরণীয় নাম আবুল কালাম আজাদ। তিনি পর পর ১০ বছর মিঃ বাংলাদেশ হয়ে আসছেন।

মহিলা ক্রীড়াতেও খুলনা পিছিয়ে নেই। এক্ষেত্রে প্রথমে ভলিবলের কথা উল্লেখ করা যায়। এখানে তাঁদের প্রাধান্য একচেটিয়া। পরপর ১২ বছর মহিলা ভলিলের জাতীয় দলের চ্যাম্পিয়ান খুলনা। মহিলা ক্রিকেটে যাঁরা বিশেষ সুনাম অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সালমা খাতুন । তিনি বর্তমানে জাতীয় মহিলা দলের অধিনায়ক। ব্যাডমিন্টন খেনাতেও মেয়েরা তাঁদের সুনাম ধরে রেখেছে। এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য হলেন কিসমাতুলল হাকিম। পঞ্চাশের দশকে তিনি ইস্ট পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ান ছিলেন। খুলনার ফেরদৌসী জাতীয় ব্যাডমিন্টন দলের কৃতি খেলোয়াড়। এছাড়া মেয়েদের কাবাডি ও হ্যান্ডবল খেলাতেও খুলনার মেয়েরা বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিতে সমর্থ হয়েছে এবং হচ্ছে। সব মিলিয়ে খুলনা এক ঐতিহ্যবাহী বৈচিত্র্যময় জনপদ। তা আমাদের এক গৌরবময় উত্তরাধিকার।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

ড. শেখ গাউস মিয়া 

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বিভিন্ন সরকারী কলেজে কর্মরত ছিলেন। 

 

ফেইসবুকে খুলনাপিডিয়া

   

গণমাধ্যমে খুলনা পিডিয়া

Call for setting up IT village in Khulna

ডিজিটাল খুলনা উৎসব আজ

আজকের আবহাওয়া

খুলনা ডিরেক্টরি

খুলনার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের,যোগাযোগের ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল ঠিকানার ডাটা বেইজ সংরক্ষণ করা হবে ।

মানচিত্রে খুলনা

উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা

দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সংক্রান্ত তথ্য,বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য গবেষণা সংস্থারগবেষণাপত্র এই বিভাগে পাওয়া যাবে।